শারীরিক সুস্থতা এবং দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে শরীরচর্চাকে অনেক ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ (যেমন: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ) প্রতিরোধের ‘ম্যাজিক পিল’ বা জাদুকরী ওষুধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ব্যায়ামের ফলে মস্তিষ্ক থেকে এন্ডোরফিন (Endorphin) এবং ডোপামিন (Dopamine) নিঃসৃত হয়, যা মানুষের মানসিক চাপ কমায় এবং কাজে মনোযোগ বৃদ্ধি করে।
তবে, অপরিকল্পিত শরীরচর্চা বা নিয়ম না মেনে খেলাধুলা করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে। পেশিতে টান লাগা, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া বা জয়েন্ট মচকানোর মতো স্পোর্টস ইনজুরিগুলো (Sports Injuries) মূলত অজ্ঞতা এবং প্রস্তুতির অভাবেই ঘটে। স্পোর্টস মেডিসিন এবং ফিজিওথেরাপির বৈজ্ঞানিক নীতিমালা অনুসরণ করে একটি নিরাপদ শরীরচর্চার রুটিন তৈরি করা সম্ভব, যা আঘাতের ঝুঁকি কমিয়ে শারীরিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেয়।
- প্রস্তুতি: শরীরকে মূল ব্যায়ামের জন্য প্রস্তুত করতে সঠিক ওয়ার্ম-আপ।
- সঠিক সরঞ্জাম: আঘাত প্রতিরোধে উপযুক্ত জুতো ও পোশাক নির্বাচন।
- সঠিক কৌশল (Technique): শরীরের বায়োমেকানিক্স বা গঠনতন্ত্র মেনে ব্যায়াম করা।
- পুনরুদ্ধার (Recovery): ব্যায়াম শেষে কুল-ডাউন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম।
Table of Contents
ওয়ার্ম-আপ (Warm-up) এবং কুল-ডাউন (Cool-down): আঘাত প্রতিরোধের প্রধান ঢাল
যেকোনো খেলা বা ব্যায়াম শুরুর আগে শরীরকে প্রস্তুত করার প্রক্রিয়াকে ওয়ার্ম-আপ বলা হয় এবং ব্যায়াম শেষে শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে কুল-ডাউন বলে। স্পোর্টস সায়েন্সের গবেষণায় প্রমাণিত যে, মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের বিজ্ঞানসম্মত ওয়ার্ম-আপ এবং কুল-ডাউন স্পোর্টস ইনজুরির ঝুঁকি প্রায় ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।
ওয়ার্ম-আপের শারীরবৃত্তীয় প্রভাব (Physiological Mechanisms)
- রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি: ওয়ার্ম-আপ করার ফলে পেশিতে রক্ত সরবরাহ এবং অক্সিজেনের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, যা পেশিকে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি জোগায়।
- সিনোভিয়াল ফ্লুইড (Synovial Fluid) নিঃসরণ: মানুষের প্রতিটি অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টে একধরনের লুব্রিকেন্ট বা তরল থাকে, যাকে সিনোভিয়াল ফ্লুইড বলে। ওয়ার্ম-আপের সময় জয়েন্টগুলো নড়াচড়া করার ফলে এই তরল নিঃসৃত হয়, যা জয়েন্টের ঘর্ষণ কমায় এবং কার্টিলেজকে সুরক্ষিত রাখে।
- ডায়নামিক স্ট্রেচিং (Dynamic Stretching): ওয়ার্ম-আপের সময় স্থির হয়ে স্ট্রেচিং না করে চলন্ত অবস্থায় স্ট্রেচিং করা উচিত (যেমন: হাত ঘোরানো, জগিং, স্কোয়াট)। এটি পেশির ইলাস্টিসিটি বা স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়।
কুল-ডাউনের বিজ্ঞান (The Science of Cool-down)
- ল্যাকটিক এসিড অপসারণ: ভারী ব্যায়ামের সময় পেশিতে ল্যাকটিক এসিড জমা হয়, যা পেশির ব্যথার (DOMS) অন্যতম কারণ। ব্যায়াম শেষে ২-৩ মিনিট ধীরে হাঁটা বা কুল-ডাউন করলে এই ল্যাকটিক এসিড দ্রুত রক্তস্রোতে মিশে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
- স্ট্যাটিক স্ট্রেচিং (Static Stretching): ব্যায়ামের শেষে পেশি যখন গরম থাকে, তখন ১৫-২০ সেকেন্ড ধরে একটি নির্দিষ্ট পজিশনে পেশিকে টেনে রাখা (স্ট্যাটিক স্ট্রেচিং) পেশির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করে এবং ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তা বাড়ায়।
| বৈশিষ্ট্যের ভিত্তি | ডায়নামিক স্ট্রেচিং (Dynamic Stretching) | স্ট্যাটিক স্ট্রেচিং (Static Stretching) |
| কখন করতে হয়? | ব্যায়াম বা খেলাধুলার ঠিক আগে (ওয়ার্ম-আপ হিসেবে)। | ব্যায়াম বা খেলাধুলার ঠিক শেষে (কুল-ডাউন হিসেবে)। |
| কাজের ধরন | শরীরকে ক্রমাগত নড়াচড়ার মধ্যে রাখা (যেমন: লাঞ্জেস, হাই-নি)। | শরীর স্থির রেখে পেশিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে টেনে ধরে রাখা। |
| মূল উদ্দেশ্য | হার্ট রেট বাড়ানো, শরীরের তাপমাত্রা ও পেশির সক্রিয়তা বৃদ্ধি। | হার্ট রেট স্বাভাবিক করা এবং পেশির নমনীয়তা (Flexibility) বৃদ্ধি। |
| আঘাতের ঝুঁকি | সঠিক সময়ে না করলে পেশিতে টান লাগার ঝুঁকি কম। | পেশি ঠান্ডা থাকা অবস্থায় (ব্যায়ামের আগে) জোর করে করলে পেশি ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। |
বয়স উপযোগী খেলাধুলা ও সঠিক সরঞ্জাম নির্বাচন
বয়সভিত্তিক ব্যায়াম ও খেলার ধরন
- শিশু ও কিশোর (৫-১৭ বছর): এই বয়সে হাড় ও পেশির গঠন চলমান থাকে। তাই তাদের জন্য জিমন্যাস্টিকস, সাঁতার, দৌড়, সাইক্লিং এবং ফুটবল বা বাস্কেটবলের মতো দলগত খেলা অত্যন্ত উপকারী। এগুলো তাদের নিউরোমোটর স্কিল (স্নায়ু ও পেশির সমন্বয়) এবং হাড়ের ঘনত্ব (Bone Density) বাড়াতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত ভারোত্তোলন (Heavy Weightlifting) এই বয়সে পরিহার করা উচিত, কারণ এটি হাড়ের গ্রোথ প্লেটকে (Growth Plate) ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
- প্রাপ্তবয়স্ক (১৮-৫০ বছর): এই বয়সে কার্ডিওভাসকুলার এন্ডুরেন্স (হৃদফুসফুসের ক্ষমতা) এবং পেশির শক্তি বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। দৌড়, অ্যারোবিক্স, স্ট্রেংথ ট্রেনিং (ওজন তোলা) এবং হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং (HIIT) এই বয়সের জন্য আদর্শ।
- প্রবীণ (৫০+ বছর): বয়সের সাথে সাথে জয়েন্টের ক্ষয় (অস্টিওআর্থ্রাইটিস) এবং হাড়ের দুর্বলতা (অস্টিওপোরোসিস) দেখা দেয়। তাই তাদের জন্য ‘লো-ইমপ্যাক্ট’ (Low-impact) ব্যায়াম—যেমন: জোরে হাঁটা (Brisk walking), ইয়োগা (Yoga) এবং সাঁতার সবচেয়ে নিরাপদ। এগুলো জয়েন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ না ফেলেই পেশি সচল রাখে এবং ব্যালেন্স বা ভারসাম্য ধরে রাখতে সাহায্য করে।
সঠিক সরঞ্জাম ও পোশাকের ভূমিকা
- পোশাক (Clothing): শরীরচর্চার সময় সুতির (Cotton) কাপড়ের বদলে সিন্থেটিক বা ‘ময়েশ্চার-উইকিং’ (Moisture-wicking) ফ্যাব্রিকের পোশাক পরা উচিত। সুতির কাপড় ঘাম শুষে নিয়ে ভারী হয়ে যায় এবং শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে ময়েশ্চার-উইকিং ফ্যাব্রিক ঘাম দ্রুত শুকিয়ে শরীরকে ঠান্ডা রাখে।
- জুতো (Footwear): খেলাধুলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম হলো সঠিক জুতো। পায়ের আর্চ (Arch) এবং শক অ্যাবজরপশন (Shock Absorption) ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে জুতো নির্বাচন করতে হয়। ভুল জুতো পরে দৌড়ালে পায়ের তলায় ‘প্লান্টার ফ্যাসাইটিস’ (Plantar Fasciitis), শিন স্প্লিন্ট (হাঁটুর নিচে ব্যথা) এবং মেরুদণ্ডে ক্রনিক ব্যথা হতে পারে।
১. খেলার মাঠের মাটি সমতল কি না তা যাচাই করুন। গর্ত বা এবড়োখেবড়ো মাঠে গোড়ালি মচকানোর (Ankle Sprain) ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
২. মাঠে কাঁচের টুকরো, পেরেক বা বিপজ্জনক কোনো বস্তু আছে কি না, তা খেলার আগে পরিষ্কার করে নিন।
৩. তীব্র রোদে (বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ৩টা) উন্মুক্ত মাঠে খেলা পরিহার করুন, এতে হিট স্ট্রোক এবং ডিহাইড্রেশনের প্রবল ঝুঁকি থাকে।
স্পোর্টস ইনজুরি বা খেলার আঘাত: ধরন ও মনস্তত্ত্ব
চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্পোর্টস ইনজুরিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১. অ্যাকিউট ইনজুরি (Acute Injury): হঠাৎ ঘটে যাওয়া আঘাত। যেমন: দৌড়াতে গিয়ে লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া, হাড় ভেঙে যাওয়া বা পেশিতে টান লাগা।
২. ক্রনিক বা ওভারইউজ ইনজুরি (Chronic/Overuse Injury): শরীরের কোনো একটি অংশের অতিরিক্ত এবং ভুল ব্যবহারের ফলে দীর্ঘমেয়াদে যে আঘাত তৈরি হয়। যেমন: টেনিস এলবো, রানার্স নি (Runner’s knee) ইত্যাদি।
খেলাধুলার সময় আঘাত পেলে অনেকেই তা লুকিয়ে রাখেন বা ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে পুনরায় খেলতে নেমে যান। এটি একটি ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক ভুল। একটি ছোট আঘাতকে অবহেলা করলে পরবর্তীতে তা সার্জারি বা স্থায়ী পঙ্গুত্ব পর্যন্ত গড়াতে পারে।
R.I.C.E. পদ্ধতি: পেশির টান ও মচকানোর গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসা
১. Rest (বিশ্রাম)
২. Ice (বরফ প্রয়োগ)
- বৈজ্ঞানিক কারণ: আঘাতের ফলে রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাত ও ফোলাভাব তৈরি হয়। বরফ প্রয়োগ করলে ‘ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন’ (Vasoconstriction) বা রক্তনালী সংকুচিত হয়, ফলে সেখানে রক্ত চলাচল কমে গিয়ে ফোলা এবং ব্যথা দ্রুত কমে যায়।
- সঠিক নিয়ম: সরাসরি চামড়ার ওপর বরফ ঘষা যাবে না। এতে ‘আইস বার্ন’ (Ice burn) বা টিস্যু ড্যামেজ হতে পারে। একটি পরিষ্কার সুতির কাপড়ে বরফের টুকরো পেঁচিয়ে ১৫-২০ মিনিটের জন্য আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে ধরে রাখতে হবে। দিনে ৩-৪ বার এটি করা উচিত।
৩. Compression (চাপ প্রয়োগ)
- সতর্কতা: ব্যান্ডেজটি খুব বেশি টাইট করে বাঁধা যাবে না। যদি ব্যান্ডেজ বাঁধার পর পায়ের আঙুল নীল হয়ে যায়, অসাড় লাগে বা স্পন্দন (Throbbing) অনুভূত হয়, তবে সাথে সাথে ব্যান্ডেজ খুলে কিছুটা ঢিলা করে বাঁধতে হবে।
৪. Elevation (উঁচু করে রাখা)
- বৈজ্ঞানিক কারণ: অভিকর্ষ বলের (Gravity) প্রভাবে এটি আঘাতের স্থানে জমে থাকা অতিরিক্ত রক্ত ও তরলকে লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের (Lymphatic system) মাধ্যমে দ্রুত শরীরে ফিরিয়ে নিয়ে ফোলা কমাতে সাহায্য করে।
- H (Heat): গরম সেঁক দেওয়া। এতে রক্তনালী প্রসারিত হয়ে ফোলা ও রক্তপাত বেড়ে যায়।
- A (Alcohol): অ্যালকোহল গ্রহণ, যা রক্তপাত বাড়ায়।
- R (Running): পুনরায় দৌড়ানো বা খেলা শুরু করা।
- M (Massage): আঘাতের স্থানে মালিশ বা ম্যাসাজ করা। কাঁচা আঘাতে মালিশ করলে টিস্যু আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ‘অসিফিকেশন’ (পেশির ভেতর হাড় গজানো) এর মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid): জরুরি মুহূর্তে জীবনরক্ষার কৌশল
রক্তপাত ও কাটা-ছেঁড়ার ব্যবস্থাপনা
খেলাধুলা বা দৈনন্দিন কাজে হাত-পা কেটে গেলে ঘাবড়ে না গিয়ে নিচের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন:
১. সরাসরি চাপ (Direct Pressure): রক্তপাত বন্ধ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একটি পরিষ্কার গজ বা সুতির কাপড় দিয়ে কাটা স্থানের ওপর ৫ থেকে ১০ মিনিট শক্ত করে চাপ দিয়ে ধরে রাখা। এতে রক্ত জমাট বাঁধতে (Blood Clotting) সুবিধা হয়।
২. পরিষ্কার করা: রক্তপাত বন্ধ হলে কাটা স্থানটি পরিষ্কার বহমান পানি (ট্যাপের পানি) বা নরমালাইন স্যালাইন (Normal Saline) দিয়ে ধুয়ে নিন। কোনোভাবেই তুলা ব্যবহার করবেন না, কারণ তুলার আঁশ ক্ষতের ভেতর আটকে গিয়ে ইনফেকশন তৈরি করতে পারে।
৩. ড্রেসিং: অ্যান্টিসেপটিক মলম লাগিয়ে একটি পরিষ্কার ব্যান্ডেজ বা ব্যান্ড-এইড দিয়ে স্থানটি ঢেকে দিন।
পুড়ে যাওয়ার (Burn) প্রাথমিক চিকিৎসা
- সঠিক চিকিৎসা: পুড়ে যাওয়া স্থানে অবিলম্বে বহমান সাধারণ তাপমাত্রার পানি (ট্যাপের পানি) ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে ঢালতে হবে। এটি ত্বকের ভেতরের স্তরের তাপমাত্রা কমিয়ে টিস্যু ড্যামেজ রোধ করে।
- ভুল ধারণা সংশোধন: পোড়া স্থানে কোনোভাবেই বরফ, টুথপেস্ট, ডিম, মাখন বা লবণ লাগানো যাবে না। বরফ ‘ফ্রস্টবাইট’ তৈরি করতে পারে এবং টুথপেস্ট ক্ষতের ভেতর কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন ঘটিয়ে তাপ আটকে রাখে, যা ইনফেকশনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যদি ফোসকা (Blister) পড়ে, তবে তা কোনোভাবেই ফাটানো যাবে না।
ফার্স্ট এইড বক্স বা প্রাথমিক চিকিৎসা বাক্সের অপরিহার্য উপাদান
- জীবাণুমুক্ত গজ পিস (Sterile Gauze) এবং বিভিন্ন সাইজের ব্যান্ড-এইড।
- মাইক্রোপোর টেপ (Micropore tape) এবং ক্রেপ ব্যান্ডেজ (Crepe Bandage)।
- অ্যান্টিসেপটিক সলিউশন (যেমন: পোভিডন আয়োডিন বা হেক্সিসল)।
- অ্যান্টিসেপটিক অয়েনমেন্ট বা মলম এবং বার্ন ক্রিম (সিলভার সালফাডায়াজিন)।
- কাঁচি (ড্রেসিং কাটার জন্য) এবং মেটাল টুইজার (চামড়ায় বিঁধে থাকা কাঁটা বা ময়লা তোলার জন্য)।
- প্যারাসিটামল (জ্বর ও ব্যথার জন্য) এবং ওরাল স্যালাইন (ডিহাইড্রেশনের জন্য)।
- ডিসপোজেবল মেডিকেল গ্লাভস (আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করার আগে পরার জন্য)।
খেলাধুলা ও আঘাত নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা বনাম বিজ্ঞান (Myths vs Facts)
- ভুল ধারণা: “নো পেইন, নো গেইন” (No pain, no gain)—অর্থাৎ ব্যথা না পেলে ব্যায়ামের কোনো লাভ হয় না।
- বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য: পেশি গঠনের সময় সামান্য পেশি ব্যথা (DOMS – Delayed Onset Muscle Soreness) হওয়া স্বাভাবিক, যা ১-২ দিনের মধ্যে সেরে যায়। কিন্তু জয়েন্টে ব্যথা, তীক্ষ্ণ সুচ ফোটার মতো ব্যথা বা ব্যায়ামের সময় হঠাৎ তীব্র ব্যথা কখনোই ভালো লক্ষণ নয়। এটি ইনজুরির পূর্বাভাস। ব্যথাকে উপেক্ষা করে ব্যায়াম চালিয়ে গেলে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
- ভুল ধারণা: গরম সেঁক দিলে যেকোনো ব্যথা দ্রুত কমে যায়।
- বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য: আঘাতের ধরন অনুযায়ী সেঁক নির্ভর করে। নতুন আঘাত (Acute injury) বা ফোলা থাকলে প্রথম ৭২ ঘণ্টা শুধুমাত্র বরফ বা কোল্ড কমপ্রেশন দিতে হবে। গরম সেঁক বা হিট থেরাপি দিতে হয় দীর্ঘমেয়াদি পেশির ব্যথায় (Chronic pain) বা ঘাড় ও কোমরের পুরোনো ব্যথায়, যেখানে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে পেশিকে শিথিল করা প্রয়োজন।
- ভুল ধারণা: বেশি ঘামলে বেশি ওজন কমে।
- বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য: ঘামের সাথে চর্বি কমার কোনো সম্পর্ক নেই। ঘাম হলো শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। অতিরিক্ত ঘামার অর্থ হলো শরীর থেকে প্রচুর পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট (লবণ) বেরিয়ে যাওয়া। ওজন কমানো নির্ভর করে ক্যালরি বার্ন বা শক্তি খরচের ওপর। তাই প্লাস্টিক বা অতিরিক্ত ভারী পোশাক পরে ব্যায়াম করা (যাতে বেশি ঘাম হয়) চরম ক্ষতিকর এবং এটি হিট স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: মচকানো বা পেশির টানের জন্য কখন ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি?
উত্তর: R.I.C.E. পদ্ধতি প্রয়োগের পরও যদি ২-৩ দিন পর ব্যথার কোনো উন্নতি না হয়, আঘাতপ্রাপ্ত জয়েন্ট নাড়ানো একেবারেই অসম্ভব হয়, অঙ্গটি অস্বাভাবিক বাঁকা দেখায় অথবা আক্রান্ত স্থানের চামড়ার রঙ পরিবর্তন হয়ে যায়, তবে দ্রুত একজন অর্থোপেডিক সার্জন বা স্পোর্টস চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এটি হাড় ভাঙা (Fracture) বা লিগামেন্ট টিয়ারের (Ligament tear) লক্ষণ হতে পারে।
প্রশ্ন: সময় কম থাকলে কি ওয়ার্ম-আপ বাদ দিয়ে সরাসরি মূল ব্যায়াম শুরু করা যাবে?
উত্তর: একেবারেই না। সময় কম থাকলে মূল ব্যায়ামের সময় কমিয়ে দিন, কিন্তু ওয়ার্ম-আপ বাদ দেওয়া যাবে না। ওয়ার্ম-আপ ছাড়া ভারী ব্যায়াম করলে মাসল পুল (Muscle pull) বা কার্ডিওভাসকুলার জটিলতার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। অন্তত ৫ মিনিটের ডায়নামিক ওয়ার্ম-আপ বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন: আঘাত পাওয়ার পর হাতের কাছে বরফ না থাকলে বিকল্প কী ব্যবহার করা যেতে পারে?
উত্তর: যদি বরফ বা আইস প্যাক না থাকে, তবে ফ্রিজে রাখা যেকোনো ফ্রোজেন সবজির প্যাকেট (যেমন: মটরশুঁটির প্যাকেট) পরিষ্কার কাপড়ে পেঁচিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি আইস প্যাকের মতোই চমৎকার কোল্ড কমপ্রেশন হিসেবে কাজ করে। এছাড়া খুব ঠান্ডা পানিতে কাপড় ভিজিয়েও পেঁচিয়ে রাখা যায়।
প্রশ্ন: ব্যায়াম শুরু করার পরদিন পেশিতে যে প্রচণ্ড ব্যথা হয় (DOMS), তা কাটানোর উপায় কী?
উত্তর: ব্যায়ামের পর পেশির এই সাধারণ ব্যথাকে DOMS (Delayed Onset Muscle Soreness) বলা হয়। এটি কাটানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ‘অ্যাক্টিভ রিকভারি’ (Active Recovery) বা হালকা হাঁটাচলা করা, পর্যাপ্ত প্রোটিন ও পানি গ্রহণ করা এবং রাতে ভালো ঘুম। পেশিতে হালকা গরম সেঁক বা ওয়ার্ম শাওয়ার (Warm shower) নিলেও এই ব্যথা দ্রুত কমে যায়।
