আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়শই ঘুম এবং বিশ্রামকে সময়ের অপচয় বা অলসতা হিসেবে গণ্য করি। বিশেষ করে ছাত্রজীবন বা পেশাগত প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে এগিয়ে থাকার জন্য মানুষ প্রথমেই যে জিনিসটিতে কাটছাঁট করে, তা হলো ঘুম। কিন্তু আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান (Neuroscience) এবং স্লিপ মেডিসিন প্রমাণ করেছে যে, ঘুম কোনো নিষ্ক্রিয় অবস্থা নয়; বরং এটি মানবদেহের এবং বিশেষ করে মস্তিষ্কের সবচেয়ে সক্রিয়, নিরাময়কারী এবং গঠনমূলক একটি প্রক্রিয়া।
পড়ালেখায় মনোযোগ বৃদ্ধি, নতুন তথ্য মনে রাখা (Memory Consolidation), মেধা বিকাশ এবং আবেগিক স্থিতিশীলতার (Emotional Regulation) জন্য সঠিক ঘুম এবং বিজ্ঞানসম্মত বিশ্রাম অপরিহার্য। মস্তিষ্ককে একটি সুপারকম্পিউটারের সাথে তুলনা করলে, সারাদিনের কাজ হলো সেই কম্পিউটারে ডেটা ইনপুট করা, আর রাতের ঘুম হলো সেই ডেটা প্রসেস করে হার্ডড্রাইভে স্থায়ীভাবে সেভ করার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় সামান্য ব্যাঘাত ঘটলে তা কেবল মানসিক ক্লান্তিই বাড়ায় না, দীর্ঘমেয়াদে এটি আলঝেইমার্স (Alzheimer’s) বা ডিমেনশিয়ার মতো নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- মেমোরি কনসোলিডেশন: সারাদিনের শেখা তথ্যগুলোকে শর্ট-টার্ম মেমোরি থেকে লং-টার্ম মেমোরিতে রূপান্তর করা।
- নিউরোনাল রিকভারি: মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত এবং নতুন নিউরাল কানেকশন তৈরি করা।
- টক্সিন নিষ্কাশন: সারাদিনের কাজের ফলে মস্তিষ্কে জমে থাকা ক্ষতিকর প্রোটিন বা বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করা।
Table of Contents
ঘুমের বিজ্ঞান: মস্তিষ্ক কীভাবে নিজেকে পুনর্গঠন করে?
NREM এবং REM স্লিপ: স্মৃতির বিন্যাস প্রক্রিয়া
গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম (Glymphatic System): মস্তিষ্কের বর্জ্য নিষ্কাশন
২০১৩ সালে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের একটি যুগান্তকারী মেকানিজম আবিষ্কার করেন, যার নাম ‘গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম’। সারাদিন মস্তিষ্ক কাজ করার ফলে সেখানে ‘অ্যামাইলয়েড-বিটা’ (Amyloid-beta) নামক একধরনের ক্ষতিকর প্রোটিন বা সেলুলার বর্জ্য জমা হয়। যখন আমরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকি, তখন মস্তিষ্কের কোষগুলো প্রায় ৬০% সংকুচিত হয়ে যায় এবং সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (Cerebrospinal Fluid) মস্তিষ্কের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এই ক্ষতিকর বর্জ্যগুলোকে ধুয়ে বের করে দেয়। অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে এই বর্জ্য মস্তিষ্কে জমতে থাকে, যা পরবর্তীতে স্মৃতিভ্রম বা ব্রেইন ফগের (Brain Fog) সৃষ্টি করে।
বয়সভিত্তিক ঘুমের চাহিদা এবং কৈশোরের বায়োলজিক্যাল ঘড়ি
তুলনামূলক টেবিল: বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বয়সভিত্তিক ঘুমের চাহিদা
| বয়সের স্তর | দৈনিক ঘুমের বৈজ্ঞানিক চাহিদা | মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব |
| শিশু (১-৫ বছর) | ১১-১৪ ঘণ্টা | শারীরিক বৃদ্ধি এবং প্রাইমারি মোটর স্কিল ডেভেলপমেন্ট। |
| স্কুলগামী (৬-১২ বছর) | ৯-১২ ঘণ্টা | একাগ্রতা বৃদ্ধি, নতুন ভাষা ও দক্ষতা শেখা। |
| কিশোর-কিশোরী (১৩-১৮ বছর) | ৮-১০ ঘণ্টা | প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের বিকাশ, হরমোন নিয়ন্ত্রণ এবং আবেগীয় পরিপক্বতা। |
| প্রাপ্তবয়স্ক (১৮-৬৪ বছর) | ৭-৯ ঘণ্টা | মেটাবলিজম নিয়ন্ত্রণ, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং কর্মক্ষমতা বজায় রাখা। |
| প্রবীণ (৬৫+ বছর) | ৭-৮ ঘণ্টা | নিউরোডিজেনারেশন বা মস্তিষ্কের ক্ষয় রোধ এবং রোগ প্রতিরোধ। |
কিশোরদের ‘ডিলেড স্লিপ ফেজ’ (Delayed Sleep Phase)]
স্লিপ হাইজিন (Sleep Hygiene): গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের বৈজ্ঞানিক কৌশল
মেলাটোনিন হরমোন এবং ডিজিটাল স্ক্রিনের ক্ষতিকর প্রভাব
- বিজ্ঞানসম্মত সমাধান (ডিজিটাল সানসেট): রাতে ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। একে ‘ডিজিটাল সানসেট’ বা ডিজিটাল সূর্যাস্ত বলা হয়। এই সময়ে বই পড়া বা হালকা স্ট্রেচিং করা যেতে পারে।
শোবার ঘরের পরিবেশ: আলো, শব্দ এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ
- তাপমাত্রা (Temperature): গভীর ঘুমের জন্য মানুষের শরীরের কোর টেম্পারেচার (Core Temperature) ১-২ ডিগ্রি কমে যাওয়া প্রয়োজন। তাই শোবার ঘরের তাপমাত্রা সামান্য শীতল হওয়া বাঞ্ছনীয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮°C থেকে ২২°C (৬৫°F – ৭২°F) তাপমাত্রা ঘুমের জন্য সবচেয়ে আদর্শ।
- অন্ধকার (Darkness): ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার হওয়া জরুরি। সামান্য নাইটলাইট বা রাস্তার আলোও মেলাটোনিন নিঃসরণে বাধা দেয়। প্রয়োজনে ব্ল্যাকআউট পর্দা বা আই-মাস্ক (Eye Mask) ব্যবহার করা যেতে পারে।
- শব্দ (Noise): ঘুমের পরিবেশ সম্পূর্ণ শান্ত থাকতে হবে। যদি বাইরের কোলাহল কমানো সম্ভব না হয়, তবে ‘হোয়াইট নয়েজ’ (White Noise) মেশিন বা ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করা মস্তিষ্কের স্ট্রেস লেভেল কমাতে সাহায্য করে।
ঘুমানোর সঠিক ভঙ্গি (Sleep Posture) এবং মেরুদণ্ডের সুরক্ষা
১. কাত হয়ে ঘুমানো (Lateral Position): চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ভঙ্গি। বিশেষ করে বাম কাত হয়ে ঘুমালে পাকস্থলীর এসিড ওপরে উঠতে পারে না (এসিড রিফ্লাক্স রোধ করে) এবং মস্তিষ্কের গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম সবচেয়ে কার্যকরভাবে বর্জ্য পরিষ্কার করতে পারে।
২. চিত হয়ে ঘুমানো (Supine Position): এটি মেরুদণ্ড ও ঘাড়ের জন্য ভালো, তবে যাদের নাক ডাকার বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার (Sleep Apnea) সমস্যা আছে, তাদের জন্য এই ভঙ্গি ক্ষতিকর।
৩. উপুড় হয়ে ঘুমানো (Prone Position): এটি ঘুমের সবচেয়ে ক্ষতিকর ভঙ্গি। এতে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বক্রতা নষ্ট হয় এবং ঘাড়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঘাড় ও পিঠের ব্যথার কারণ হয়।
ব্রেইন ফুড (Brain Food): মেধা বিকাশ ও মানসিক তীক্ষ্ণতার পুষ্টিবিজ্ঞান
ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মেকানিজম
স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক শীর্ষ খাবারসমূহ
১. বাদাম ও বীজ (Nuts & Seeds):
আখরোট (Walnuts), কাঠবাদাম এবং চিয়া সিড ওমেগা-৩, ভিটামিন ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পাওয়ার হাউস। ভিটামিন ই কগনিটিভ ডিক্লাইন বা বয়সের সাথে সাথে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার হারকে ধীর করে দেয়। (আকর্ষণীয় বিষয় হলো, আখরোটের বাহ্যিক গঠন দেখতে অবিকল মানব মস্তিষ্কের মতোই)।
২. খেজুর (Dates):
খেজুর হলো মস্তিষ্কের জন্য তাৎক্ষণিক শক্তির একটি চমৎকার প্রাকৃতিক উৎস। এতে থাকা গ্লুকোজ ব্রেইন ফাংশনকে দ্রুত বুস্ট করে। এছাড়া খেজুরে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে, যা স্নায়ুতন্ত্রের সিগন্যালিং সিস্টেমকে উন্নত করে এবং মানসিক ক্লান্তি দূর করে।
৩. তাজা ফলমূল (বেরি ও লেবুজাতীয় ফল):
ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি, কমলা এবং আঙুরে প্রচুর ফ্ল্যাভোনয়েড (Flavonoids) থাকে। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের মেমোরি সেন্টার বা ‘হিপোক্যাম্পাস’ (Hippocampus)-এর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৪. সবুজ শাকসবজি (Dark Leafy Greens):
পালং শাক, ব্রকলি এবং পাতাকপিতে ভিটামিন কে (Vitamin K), লুটেইন (Lutein) এবং ফলেট (Folate) থাকে। ভিটামিন কে মস্তিষ্কের কোষের ভেতরে ‘স্ফিঙ্গোলিপিড’ (Sphingolipids) নামক ফ্যাট তৈরিতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে, যা স্মৃতিশক্তি প্রখর রাখে।
মস্তিষ্কের হাইড্রেশন (Hydration) এবং পানির গুরুত্ব
- কর্মপদ্ধতি: পানি মস্তিষ্কের কোষগুলোতে পুষ্টি সরবরাহ করে এবং টক্সিন বের করে দেয়। পড়ালেখার সময় বা কাজের টেবিলে সব সময় এক গ্লাস পানি রাখা এবং প্রতি ঘণ্টায় অল্প অল্প করে পানি পান করা মানসিক তীক্ষ্ণতা বজায় রাখার একটি পরীক্ষিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
বিশ্রাম বনাম অলসতা: মানসিক ক্লান্তি দূর করার মনস্তাত্ত্বিক উপায়
অলসতা এবং বিশ্রাম: ডোপামিন মেকানিজমের পার্থক্য
- অলসতা (Laziness): এটি হলো কোনো কাজ না করে নিষ্ক্রিয় সময় কাটানো, যেমন—ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা বা সোফায় শুয়ে টিভি দেখা। এ সময় মস্তিষ্কে ‘জিপসি ডোপামিন’ রিলিজ হয়, যা সাময়িক আনন্দ দিলেও কিছুক্ষণ পরই চরম শূন্যতা, অনুশোচনা (Guilt) এবং আরও বেশি মানসিক ক্লান্তি (Mental Burnout) তৈরি করে।
- বিশ্রাম বা অ্যাক্টিভ রেস্ট (Active Rest): বিশ্রাম হলো সচেতনভাবে শরীর ও মনকে এমন কিছু কাজে নিয়োজিত করা, যা শক্তি ক্ষয় না করে উল্টো শক্তি সঞ্চয় করে। প্রকৃত বিশ্রাম প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে (Parasympathetic Nervous System) সক্রিয় করে, যা হার্ট রেট কমায় এবং মস্তিষ্ককে শান্ত করে।
মানসিক ক্লান্তি (Brain Fatigue) দূর করার বৈজ্ঞানিক কৌশল
১. মাইন্ডফুলনেস (Mindfulness) চর্চা:
পড়ালেখা বা একটানা কাজের পর ব্রেইন ফগ (Brain Fog) তৈরি হয়। এই অবস্থা থেকে দ্রুত মুক্তির উপায় হলো মাইন্ডফুলনেস। এটি হলো অতীত বা ভবিষ্যতের চিন্তায় মগ্ন না থেকে বর্তমান মুহূর্তের প্রতি সম্পূর্ণ ফোকাস করা।
- প্রয়োগ: ১০ মিনিটের জন্য নিরিবিলি বসে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিন। এই চর্চা মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের (Prefrontal Cortex) গ্রে ম্যাটার (Grey Matter) বৃদ্ধি করে, যা ফোকাস ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ায়।
২. প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ (Attention Restoration Theory):
পরিবেশ মনোবিজ্ঞানের ‘অ্যাটেনশন রেস্টোরেশন থিওরি’ (ART) অনুযায়ী, শহুরে কোলাহল বা স্ক্রিনের দিকে তাকালে আমাদের মস্তিষ্কের ‘ডিরেক্টেড অ্যাটেনশন’ বা নিয়ন্ত্রিত মনোযোগ ক্ষয় হয়। কিন্তু যখন আমরা প্রকৃতির দিকে (গাছপালা, আকাশ, পাখি বা জলের প্রবাহ) তাকাই, তখন মস্তিষ্ক একধরনের ‘সফট ফ্যাসিনেশন’ (Soft Fascination) অনুভব করে, যা কোনো চেষ্টা ছাড়াই মস্তিষ্ককে রিস্টার্ট বা রিফ্রেশ করে দেয়।
৩. শখের চর্চা এবং ফ্লো স্টেট (Flow State):
অলস সময় না কাটিয়ে এমন কোনো শখের কাজ (যেমন: বাগান করা, ছবি আঁকা, ক্যালিগ্রাফি বা ইনস্ট্রুমেন্ট বাজানো) করা, যেখানে আপনি সময়ের হিসাব ভুলে যান। মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিক্সেন্টমিহায়ি (Mihaly Csikszentmihalyi) এই অবস্থাকে ‘ফ্লো স্টেট’ বলেছেন। ফ্লো স্টেটে মস্তিষ্ক থেকে একযোগে ডোপামিন, এন্ডোরফিন এবং সেরোটোনিন নিঃসৃত হয়, যা নিখাদ বিশ্রাম এবং পরম আনন্দ প্রদান করে।
[Tip Box: প্রোমোডোরো টেকনিক (Pomodoro Technique) এবং মাইক্রো-রেস্ট]
দীর্ঘক্ষণ পড়ার সময় একটানা মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রোমোডোরো টেকনিক ব্যবহার করুন: ২৫ মিনিট সম্পূর্ণ ফোকাস দিয়ে পড়ুন, এরপর ৫ মিনিটের একটি ‘মাইক্রো-রেস্ট’ নিন। এই ৫ মিনিটে ফোন না ধরে, ঘরের ভেতর একটু হাঁটাহাঁটি করুন, পানি পান করুন বা জানালা দিয়ে বাইরে তাকান। এরপর আবার ২৫ মিনিট পড়ায় বসুন। এটি মস্তিষ্কের তথ্য ধারণক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ঘুম ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা বনাম বৈজ্ঞানিক সত্য (Myths vs Facts)
সমাজ এবং কালচারের কারণে ঘুম ও ব্রেইন হেলথ নিয়ে আমাদের মনে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে এগুলো পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি:
- ভুল ধারণা: “সপ্তাহের কাজের দিনে কম ঘুমিয়ে উইকেন্ডে (ছুটির দিনে) বেশি ঘুমিয়ে তা পুষিয়ে নেওয়া যায়।” (Sleep Debt Myth)
- বৈজ্ঞানিক সত্য: ঘুম কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয় যে আপনি ধার করে পরে শোধ করবেন। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ঘাটতি মস্তিষ্কের যে সেলুলার ড্যামেজ বা কোষের ক্ষতি করে, তা একদিন ১২ ঘণ্টা ঘুমিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এটি ‘সোশ্যাল জেট-ল্যাগ’ (Social Jetlag) তৈরি করে, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং ওঠার রুটিন থাকাটাই বিজ্ঞানসম্মত।
- ভুল ধারণা: “নাক ডাকা হলো গভীর ঘুমের লক্ষণ।”
- বৈজ্ঞানিক সত্য: এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি ভুল ধারণা। জোরে নাক ডাকা হলো অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (Obstructive Sleep Apnea – OSA)-এর অন্যতম প্রধান লক্ষণ। এই রোগে ঘুমের মধ্যে শ্বাসতন্ত্র সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এটি স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- ভুল ধারণা: “যাদের বয়স বেশি, তাদের কম ঘুম হলেও চলে।”
- বৈজ্ঞানিক সত্য: বয়সের সাথে সাথে মানুষের ঘুমের প্যাটার্ন বা গভীরতা (NREM sleep) কমে যায় ঠিকই, কিন্তু ঘুমের চাহিদা কমে না। একজন প্রবীণ মানুষেরও মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে এবং আলঝেইমার্স প্রতিরোধ করতে দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন রয়েছে।
- ভুল ধারণা: “কফি খেলে ক্লান্তি দূর হয় এবং বিশ্রাম হয়।”
- বৈজ্ঞানিক সত্য: কফিতে থাকা ক্যাফেইন (Caffeine) ক্লান্তি দূর করে না, এটি কেবল মস্তিষ্ককে ধোঁকা দেয়। মস্তিষ্কের ‘অ্যাডিনোসিন’ (Adenosine) নামক কেমিক্যাল আমাদের ক্লান্তির অনুভূতি দেয়। ক্যাফেইন এই অ্যাডিনোসিন রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে রাখে। ফলে আমরা ক্লান্তি অনুভব করি না, কিন্তু মস্তিষ্কের ভেতরের সেলুলার ক্লান্তি ঠিকই বাড়তে থাকে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: দিনের বেলা পাওয়ার ন্যাপ (Power Nap) নেওয়া কি মস্তিষ্কের জন্য ভালো?
উত্তর: হ্যাঁ, সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত। দুপুর ১টা থেকে ৩টার মধ্যে (সার্কেডিয়ান ডিপ-এর সময়) ২০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম বা পাওয়ার ন্যাপ মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি এবং রিঅ্যাকশন টাইম বা প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রায় ৩৪% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। তবে এটি যেন কোনোভাবেই ৪৫ মিনিটের বেশি না হয়, কারণ তখন মানুষ গভীর ঘুমে (NREM) প্রবেশ করে এবং হঠাৎ উঠলে ‘স্লিপ ইনারশিয়া’ (Sleep Inertia) বা মাথাব্যথা অনুভব করে।
প্রশ্ন: মানসিক চাপ বা ওভারথিংকিংয়ের (Overthinking) কারণে রাতে ঘুম না এলে কী করব?
উত্তর: বিছানায় শুয়ে ২০ মিনিটের বেশি ঘুম না আসলে জোড় করে শুয়ে থাকবেন না। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে অন্য কোনো হালকা আলোতে বই পড়ুন বা রিলাক্সেশন ব্যায়াম করুন। বিছানাকে কেবল ঘুমের জায়গা হিসেবেই মস্তিষ্কে প্রোগ্রাম করতে হবে। ওভারথিংকিং কমানোর জন্য ‘ব্রেইন ডাম্পিং’ (Brain Dumping) কৌশল ব্যবহার করতে পারেন—ঘুমানোর আগে কালকের কাজগুলো বা দুশ্চিন্তার বিষয়গুলো একটি ডায়েরিতে লিখে ফেলা। এতে মস্তিষ্ক সিগন্যাল পায় যে বিষয়গুলো সংরক্ষিত আছে এবং এখন ভাবার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন: পরীক্ষার আগের রাতে না ঘুমিয়ে সারারাত পড়া (All-nighter) কি বেশি নম্বর পেতে সাহায্য করে?
উত্তর: এটি শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় ভুল। সারারাত জেগে পড়লে মস্তিষ্কের ‘হিপোক্যাম্পাস’ (যেখানে স্মৃতি জমা হয়) নতুন তথ্য গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয়। অর্থাৎ, আপনি যা পড়বেন তা সাময়িক মনে থাকলেও পরীক্ষার হলে গিয়ে ভুলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। এর চেয়ে রাতে ৬ ঘণ্টা ঘুমিয়ে সকালে রিভিশন দিলে মেমোরি রিকল (Memory Recall) বা মনে করার ক্ষমতা কয়েকগুণ বেশি থাকে।
প্রশ্ন: কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেলে কি তাৎক্ষণিকভাবে মেধা বেড়ে যায়?
উত্তর: না, এমন কোনো ম্যাজিক খাবার নেই যা খেলে রাতারাতি মেধা বা আইকিউ (IQ) বেড়ে যাবে। তবে নিয়মিত ওমেগা-৩ (মাছ, বাদাম), অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (ফলমূল) এবং পর্যাপ্ত পানি পান দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের নিউরোজেনেসিস (নতুন ব্রেইন সেল তৈরি) বৃদ্ধি করে এবং কগনিটিভ পারফরম্যান্স বা মেধা বিকাশে সরাসরি সহায়তা করে।
